×
×
Monday, 27 July, 2026, 3:07 am


মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে সংকট, হুমকির মুখে শিল্প অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবং উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে গভীর সংকট তৈরি করেছে, যা বিশ্ব শিল্প অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই অঞ্চলের অস্থিরতা শুধুমাত্র ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের বাজার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম বর্তমানে জ্বালানি সংকটে পড়েছে। রড উৎপাদন ও পরিবহনের জন্য প্রতিষ্ঠানটির প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হলেও চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত জানান, গত শনিবার ডিপো থেকে মাত্র ৯ হাজার লিটার ডিজেল পাওয়া গেছে, আর রোববার কোনো তেলই সরবরাহ হয়নি। এ কারণে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পেয়ে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

শিল্পমালিকরা জানিয়েছেন, ঈদের দীর্ঘ ছুটির পর কারখানাগুলো পূর্ণমাত্রায় চালু হয়েছে। ফলে জ্বালানির চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। দ্রুত সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে উৎপাদন ও লজিস্টিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এ অবস্থায় তারা সরকারের কাছে জ্বালানি সরবরাহের বাস্তব চিত্র বিবেচনা করে প্রয়োজন হলে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিতে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। সেখানকার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পারস্য উপসাগর হয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। চলতি মাসে ১৭টি জাহাজে ডিজেল আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তার মধ্যে মাত্র ৯টি জাহাজ এসেছে, একটি পথে রয়েছে এবং বাকি জাহাজগুলোর সময়সূচি অনিশ্চিত।

এরই মধ্যে জ্বালানি সংকট সামাল দিতে ঈদের আগে সরকার সাময়িকভাবে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। তবে পরবর্তীতে তা তুলে নেওয়া হলেও ডিপো থেকে সরবরাহ কম থাকায় অনেক পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও অবৈধভাবে জ্বালানি মজুতের প্রবণতাও বাড়ছে।

দেশের আরেকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল জানায়, তাদের কারখানা ও পরিবহন ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন হয়। চাহিদার তুলনায় বর্তমানে তারা প্রায় ৬০ শতাংশ জ্বালানি ডিপো থেকে পাচ্ছে, যা উৎপাদন ও সরবরাহে সমস্যা তৈরি করছে।

অন্যদিকে, বিভিন্ন শিল্পকারখানায় লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালানোর জন্য ডিজেল প্রয়োজন হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানই তা সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে উৎপাদন কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

হস্তশিল্প রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও একই সমস্যার সম্মুখীন। লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানা চালু রাখতে জেনারেটর ব্যবহারের প্রয়োজন হলেও ডিজেলের অভাবে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

পিভিসি পাইপ, প্লাস্টিক পণ্য ও গৃহস্থালি সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও কাঁচামাল আমদানির পাশাপাশি জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ও সরবরাহে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তৈরি পোশাক খাতেও লোডশেডিং ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শিল্প মালিকদের সংগঠনগুলো জানিয়েছে, অনেক কারখানা পাম্প থেকে প্রয়োজনীয় ডিজেল পাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে তারা সরকারের সঙ্গে বৈঠক করে সমাধানের চেষ্টা করছে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কারখানাগুলোর জ্বালানি চাহিদা সংগ্রহ করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক ধরে নেওয়ার পরিবর্তে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। সীমিত জ্বালানিকে সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করতে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও সেবা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রিত বণ্টন বা রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা উচিত। পাশাপাশি ভবিষ্যতে জ্বালানি চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল ও কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

আরও