×
×
Friday, 30 October, 2026, 5:55 pm


“জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক ক্ষতি”

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, যা ইতিমধ্যে দেশের স্বাস্থ্য, জনজীবন ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। ২০২৪ সালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি শুধু পরিবেশগত উদ্বেগের বিষয় নয়, বরং এটি একটি তীব্র অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে ।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব এখন বাস্তব। বাংলাদেশ, ভৌগোলিক অবস্থান ও ঘন জনসংখ্যার কারণে, এই প্রভাবের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলির মধ্যে একটি। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক এবং দ্য ল্যানসেটের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি সরাসরি জনস্বাস্থ্য, শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের তাপমাত্রা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একই সময়ে “অনুভূত” তাপমাত্রা বা হিট ইনডেক্স বেড়েছে ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস । রাজধানী ঢাকা শহর জাতীয় গড়ের চেয়ে ৬৫ শতাংশ বেশি হারে উষ্ণ হয়েছে, যা দ্রুত ও পরিকল্পনাহীন নগরায়নের ফলে সৃষ্ট “আরবান হিট আইল্যান্ড” প্রভাবকে নির্দেশ করে ।

উচ্চ তাপমাত্রার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ইতিমধ্যেই বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ২০২৪ সালে বিভিন্ন খাতে এই ক্ষতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে

· বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন: “এন আনসাসটেইনেবল লাইফ: দ্য ইমপ্যাক্ট অব হিট অন হেলথ অ্যান্ড দ্য ইকোনমি অব বাংলাদেশ” শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে শুধু তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশ হারিয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ১.৩৩ বিলিয়ন থেকে ১.৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ।

· দ্য ল্যানসেট কাউন্টডাউন প্রতিবেদন: আরও বিস্তৃত পরিসর বিবেচনায় নিয়ে ২০২৪ সালে চরম তাপপ্রবাহের কারণে শ্রম উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়ে ২৪ বিলিয়ন ডলার আয় কমে গেছে, যা বাংলাদেশের জিডিপির ৫ শতাংশের সমতুল্য। এই ক্ষতির ৫৫ শতাংশ একাই এসেছে কৃষি খাত থেকে ।

উচ্চ তাপমাত্রা সরাসরি মানুষের কাজ করার সক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে।

· ২০২৪ সালে তাপ-সম্পর্কিত অসুস্থতার কারণে বাংলাদেশে ২৫ কোটি কার্যদিবস নষ্ট হয়েছে ।

· দ্য ল্যানসেটের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় ২০২৪ সালে তাপজনিত কারণে সম্ভাব্য কর্মঘণ্টা কমেছে ২৯০০ কোটি ঘণ্টা, যা ৯২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ কর্মঘণ্টা হারিয়েছে কৃষি শ্রমিকরা ।

শুধু ২০২৪ সালেই ক্ষতি থেমে নেই। বিশ্বব্যাংকের আরেকটি প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি ৬.৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে এবং ১৩.৪ কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান হুমকির মুখে পড়তে পারে । আরেকটি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে চরম তাপপ্রবাহের কারণে জিডিপির ৪.৯ শতাংশ হারাতে পারে বাংলাদেশ ।

অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এই ক্ষতির প্রভাব পড়ছে।

· স্বাস্থ্য খাত: তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে গেলে ডায়রিয়া হওয়ার ঝুঁকি ৪৭.৭ শতাংশ, ক্লান্তি ২৬.৫ শতাংশ এবং উদ্বেগজনিত সমস্যা ৩৭.১ শতাংশ বেড়ে যায় । শীতের তুলনায় গ্রীষ্মকালে ডায়রিয়ার প্রকোপ দ্বিগুণ হয় ।

· পোশাক শিল্প: কর্নেল ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, যদি প্রয়োজনীয় অভিযোজন ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ২২ শতাংশের বেশি কমে ৯৫.৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বন্যার কারণে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়াকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই সংকট মোকাবিলায় কিছু জরুরি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপপ্রবাহকে বন্যার মতোই দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে জাতীয় প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে । স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে হাসপাতালগুলোতে তাপজনিত রোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। শহরে তাপের প্রভাব কমাতে সবুজায়ন বাড়ানো এবং নগর পরিকল্পনা আধুনিকায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, তাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ জোরদার করতে হবে । সবশেষে, ক্ষয়ক্ষতি পূরণে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে ।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, বরং এটি বর্তমানের একটি কঠিন বাস্তবতা। স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিল্পের ওপর এর বিস্তর প্রভাব দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই ধারা পরিবর্তন করা সম্ভব, কিন্তু আর দেরি নয়।

[atn_photocard]
আরও