প্রাকৃতিক জীবন থেকে সরে এসে আমরা কি ডেকে আনছি মহাবিপদ?
আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, চিকিৎসা নির্ভরতা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এক সময় গ্রাম-বাংলার প্রতিটি ঘরেই ছিল ভোরবেলার হাতিশালার ধূপ, গোয়ালঘরের মায়াময় ডাক আর মাঠ থেকে ভেসে আসা কাঁচা ঘাসের গন্ধ। কৃষক তার নিজের জমিতে ফলানো শাকসবজি, ধান আর ডাল দিয়ে ভরিয়ে রাখতেন সংসারের চাহিদা। মায়ের হাতে তৈরি সেই খাবারের পাতে পড়ত টাটকা শাক, পুকুরের ইলিশ কিংবা দেশি মুরগির ঝোল। সময় বদলেছে। আজ সেই চিত্র প্রায় উধাও। তার বদলে শহর-গ্রামের সর্বত্রই পসরা সাজিয়ে বসেছে প্রক্রিয়াজাত খাবার, ভেজালপ্রবণ বাজার আর কৃত্রিম জীবনযাত্রা। এর ফলাফল হিসেবে মানবসমাজ দিন দিন আধুনিক চিকিৎসা ও ওষুধের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
প্রাকৃতিক খাদ্য থেকে দূরত্বঃ
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এখন আর স্থানীয় বাজার থেকে তোলা টাটকা শাকসবজি জায়গা পায় না। বাড়ির আঙিনায় ফলন্ত পেয়ারা, জামরুল বা কাঁঠালের পরিবর্তে আমরা সুপারশপ থেকে কেনা মাস-পুরোনো সংরক্ষিত ফলমূল খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এক সময় ধান কাটার পর তা মেরামত করে খাওয়ার সময় তার পুষ্টিগুণ অটুট থাকত। এখন চাল প্রক্রিয়াজাত করে পলিশ করে তা ফ্যাকাশে সাদা করা হয়, যা থেকে বেরিয়ে যায় ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স ও ফাইবারের বড় অংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজেদের হাতে ফলানো খাদ্য থেকে সরে আসার ফলে আমরা শুধু পুষ্টি থেকেই বঞ্চিত হচ্ছি না, বরং কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের তৈরি খাদ্যগ্রহণ করে শরীরে বিষ জমাচ্ছি। এতে কমছে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, বাড়ছে ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো জটিল ব্যাধি।
ভেজালের বাজারে আস্থাহীনতাঃ
বাজারে এখন শাকসবজিতে ফরমালিন, ফলে কার্বাইড, দুধে ইউরিয়া, মাছে ফর্মালিন ও চিনিতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি নিত্যদিনের খবর। খাদ্যের এই ভেজাল যেমন শরীরের জন্য হুমকি, তেমনি ওষুধ শিল্পেও একই চিত্র। নিম্নমানের ওষুধ, ভেজাল ওষুধ ও নকল ওষুধের কারসাজিতে বারবার দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সরকারি সংস্থাগুলো কাজ করলেও আইন প্রয়োগের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে অসাধু চক্র।
বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ ডা. শামীমা আক্তার বলেন, “মানুষ মনে করেন অসুখ হলেই ওষুধ খাবেন, কিন্তু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেবেন না। শরীর যখন বিষাক্ত খাদ্যে ভরে যায়, তখন ওষুধ সেই রোগ নিরাময় করতে পারে না, বরং শরীর নতুন নতুন রোগের আকর হয়ে ওঠে। ফলে আমরা চিকিৎসা নির্ভর হয়ে পড়ছি, কিন্তু সুস্থ হচ্ছি না।”
আর্টিফিশিয়াল জীবনব্যবস্থাঃ
শহুরে জীবনে এখন সবই কৃত্রিম। দিনের আলোতে কাজ না করে রাত জেগে কৃত্রিম আলোয় কাজ, ফাস্টফুড খেয়ে সময় বাঁচানোর চেষ্টা আর ব্যায়ামহীন জীবনযাত্রা আমাদের শরীরকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে তুলছে। বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ আর মানসিক চাপ তো আছেই। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই ছেদ পড়ায় ঘুমচক্র নষ্ট হচ্ছে, হজমশক্তি কমছে, অ্যাসিডিটি ও বদহজমের সমস্যা বাড়ছে।
বায়ো-রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ ড. নাজমুল হুদা মনে করেন, “প্রাকৃতিক জীবনব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমরা বড় ভুল করছি। প্রকৃতি আমাদের সুস্থ থাকার সব উপকরণ দিয়েছে, কিন্তু আমরা সেগুলোকে অবহেলা করে রাসায়নিক ও ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি।”
সমাধানের পথঃ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো নিজেদের জীবনযাত্রায় ফিরিয়ে আনা প্রাকৃতিক অভ্যাস। বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় টবেই হোক, সবজি চাষের চেষ্টা করতে হবে। স্থানীয় কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি শাকসবজি কেনার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিতে সরকারের তরফ থেকে কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
এছাড়া নিজের শ্রমে খাদ্য উৎপাদনের যে আনন্দ ও স্বাস্থ্যগুণ, তা বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুল-কলেজে উদ্যানচর্চা, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং প্রকৃতির কাছাকাছি ফিরে যাওয়ার প্রচেষ্টা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে সহায়তা করবে।
পরিশেষে বলা যায়, আমরা যদি আজ না জাগি, তবে আগামী দিনে আমাদের শিশুদের হাতে তুলে দেবো এক অসুস্থ পৃথিবী। আধুনিকতা অস্বীকার নয়, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাই হতে পারে সুস্থ জীবনযাত্রার একমাত্র পথ।