ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্য সুখবর, ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত শুল্কমুক্ত
দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে টাকা জমা রাখার ওপর আবগারি শুল্ক নিয়ে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। বিশেষ করে যখন মূল্যস্ফীতি বাড়ে, সুদের প্রকৃত হার কমে যায় এবং ব্যাংক খাত নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় তখন এই শুল্ক অনেকের কাছে অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে ধরা দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাবে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা থাকলে আর কোনো আবগারি শুল্ক দিতে হবে না। বর্তমানে এই সীমা ৩ লাখ টাকা, ফলে নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ছোট আমানতকারীরা সরাসরি উপকৃত হবেন।
বাজেটে কী আসতে পারে
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই ঘোষণা দিতে পারেন।
নীতিনির্ধারকদের মতে, এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ধরে রাখা এবং ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়া।
কীভাবে আবগারি শুল্ক কাটা হয়
বর্তমানে বছরে ব্যাংক হিসাবে সর্বোচ্চ যে ব্যালেন্স থাকে, তার ওপর ভিত্তি করে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ বছরের কোনো এক সময় যদি হিসাবের স্থিতি নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সেই অনুযায়ী শুল্ক প্রযোজ্য হয়।
বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী:
৩ লাখ টাকা পর্যন্ত: কোনো শুল্ক নেই
৩ লাখ–১০ লাখ টাকা: ৫০০ টাকা
এরপর ধাপে ধাপে বাড়ে
৫ কোটি টাকার বেশি: বছরে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা
নতুন প্রস্তাবে শুধু প্রথম স্তরটি পরিবর্তন করা হবে অর্থাৎ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত থাকবে, তবে পরবর্তী স্তরগুলো অপরিবর্তিত থাকবে।
কেন এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট, আর্থিক অনিয়ম এবং আমানতকারীদের আস্থাহীনতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব যুক্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আমানতের সুদের হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকায় প্রকৃত অর্থে সঞ্চয়কারীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এর ওপর আবার শুল্ক কাটা হলে ছোট সঞ্চয়কারীদের হতাশা বাড়ে।
বাস্তব আচরণে কী দেখা যাচ্ছে
ব্যাংকারদের মতে, অনেক গ্রাহক শুল্ক এড়াতে
টাকা একাধিক হিসাবে ভাগ করে রাখেন
অথবা নির্দিষ্ট সীমার নিচে রাখার চেষ্টা করেন
ফলে নগদ অর্থ ব্যাংকের বাইরে রাখার প্রবণতাও বাড়ছে, যা অর্থনীতির জন্য অনুকূল নয়।
সরকারের রাজস্বে প্রভাব
বর্তমানে ব্যাংক খাত থেকে বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা আবগারি শুল্ক আদায় হয়। নতুন সীমা চালু হলে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা কম রাজস্ব আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সরকারের মতে, ক্ষুদ্র আমানতকারীদের স্বস্তি দেওয়া এখন বেশি জরুরি। কারণ ব্যাংকের প্রতি আস্থা কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি
অনেক অর্থনীতিবিদ দীর্ঘদিন ধরে এই শুল্ক ব্যবস্থার সমালোচনা করে আসছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-এর গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, ব্যাংক আমানতের ওপর এ ধরনের শুল্ক ধীরে ধীরে তুলে দেওয়া উচিত।
তার মতে, এটি কার্যত সঞ্চয়ের ওপর এক ধরনের ‘অপ্রত্যক্ষ জরিমানা’। এর পরিবর্তে সম্পদভিত্তিক কর বা আধুনিক ওয়েলথ ট্যাক্স ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে প্রকৃত উচ্চ সম্পদশালীরা বেশি কর দেন।
মূল সমস্যা কোথায়
বর্তমান শুল্ক কাঠামোর একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো
এটি আয় বা মুনাফার ওপর নির্ভর করে না, বরং সঞ্চয়ের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।
ফলে একজন সাধারণ সঞ্চয়কারী এবং একজন বড় ব্যবসায়ী দুজনকেই একই নিয়মে শুল্ক দিতে হয়, যা অনেকের কাছে ন্যায়সঙ্গত নয়।
আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে নানা অনিয়ম ও দুর্বলতা সামনে এসেছে। এর ফলে অনেকেই বড় অঙ্কের টাকা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকে রাখতে দ্বিধাগ্রস্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শুল্ক কমানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন
সুশাসন নিশ্চিত করা
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ
আমানতের নিরাপত্তা বাড়ানো
আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
মূল্যস্ফীতির চাপ
বর্তমানে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে মানুষের ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে অনেক পরিবার নিয়মিত সঞ্চয় করতে পারছে না।
যারা সঞ্চয় করছেন, তারাও প্রকৃত লাভ পাচ্ছেন না কারণ সুদের হার যদি মূল্যস্ফীতির নিচে থাকে, তাহলে সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য কমে যায়। এই অবস্থায় আবগারি শুল্ক অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
সামনে কী হতে পারে
বিশ্লেষকদের ধারণা, আপাতত সীমা বাড়ানো হলেও ভবিষ্যতে পুরো শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয় উৎসাহিত করার নীতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দীর্ঘমেয়াদে আয় ও সম্পদভিত্তিক কর ব্যবস্থার দিকে যাওয়াই হতে পারে কার্যকর সমাধান।
ব্যাংক আমানতে শুল্কমুক্ত সীমা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাবটি শুধু একটি কর-সুবিধা নয় এটি সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমানো এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।