নিয়ম জানি, কিন্তু মানি না: সমাজের এক চিরচেনা দ্বিচারিতার প্রতিচ্ছবি
‘নিয়ম জানি, কিন্তু মানি না’ আমাদের সমাজের দৈনন্দিন চালচিত্রে যেন এ কথাটি গেঁথে আছে। ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে শুরু করে পাবলিক প্লেসের আচরণবিধি, সর্বত্র আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার মানসিকতা যেন অনেকের নিত্যসঙ্গী। সম্প্রতি রাজধানীর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠে এক সাংবাদিক প্রত্যক্ষ করেছেন আইন ও বিধানের প্রতি এই উদাসীনতার এক চরম উদাহরণ।
গত সপ্তাহে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি সিএনজিতে ওঠেন প্রতিবেদক। শহরের ব্যস্ত সড়কে পা দিয়েই চালকের বেপরোয়া চালনা চোখে পড়ে। উল্টো পথে ওভারটেক, সিগন্যাল অমান্য ও অপ্রয়োজনীয় বেগ সবকিছুতেই যেন তার অলিখিত অধিকার। প্রতিবেদকের বিনীত অনুরোধে, “ভাই, একটু সাবধানে চালান” চালক হেসে জানান, সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে এভাবে চালানো ছাড়া উপায় নেই।
গন্তব্যে পৌঁছাতে বাকি মাত্র কিছুক্ষণ। প্রবেশ করলেন ক্যান্টনমেন্টের জাহাঙ্গীর গেট। আর তৎক্ষণাৎ বদলে গেল চালকের আচরণ। গতি কমিয়ে আনা হলো ধীরস্থির পর্যায়ে। চালকের এই হঠাৎ রূপান্তর দেখে বিস্মিত প্রতিবেদকের প্রশ্নে, চালকের জবাব ছিল চোখে পড়ার মতো “এটা ক্যান্টনমেন্ট, সাহেব। এখানে আইন কঠোর। নিয়ম ভাঙলে শাস্তি পেতে হবে।”
প্রতিবেদক একমুঠো হাসিতে মনে মনে ভাবলেন, মানুষ আসলে নিয়ম জানে, বোঝেও, কিন্তু মানে না যতক্ষণ না শাস্তির ভয় তাকে বাধ্য করে। রাস্তায় কোনো ট্রাফিক পুলিশ নেই বলে যেমন অনেকেই হেলমেট পরেন না, হাতের কাছে ময়লা ফেলার ডাস্টবিন না থাকলে রাস্তায় আবর্জনা ফেলতে দ্বিধা করেন না।
এই দ্বিচারিতার চিত্রটি কিন্তু শুধু একজন সিএনজিচালকের নয়; আমাদের সমাজের নানা স্তরে ছড়িয়ে আছে। অফিস থেকে শুরু করে ব্যক্তিজীবন নিয়ম মানাটা তখনই শুরু হয়, যখন শাস্তির প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়। আর যেখানে শাস্তি এড়ানোর সুযোগ আছে, সেখানে স্বেচ্ছায় নিয়ম মানার প্রবণতা অনেকের মাঝেই দেখা যায় না।
প্রতিবেদকের বিশ্লেষণ: শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বোধ শুধু নৈতিক শিক্ষায় গড়ে ওঠে না; জনসচেতনতার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন কঠোর আইনের যথাযথ প্রয়োগ। কোনো দেশের ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে কার্যকর হলে দুর্ঘল্পনা কমে, যেমনটি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় চালকের আচরণে প্রতিফলিত হয়েছিল। তেমনি সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও শুধু ‘নিয়ম জানা’ নয়, বরং ‘নিয়ম মানা’ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন আইনের কঠোর হাত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
তবেই না সভ্য সমাজ গড়ার ভিত হবে মজবুত, যেখানে প্রতিটি নাগরিক স্বেচ্ছায় নয়, বাধ্য হয়েও আইন মেনে চলতে শিখবে। আর বাধ্য হয়ে বারবার মেনে চললেই একদিন তা অভ্যাসে পরিণত হবে।